১৩ জুলাই। চাকরিতে সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিলের দাবিসহ ১০দফা নির্দেশনা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এর সংগঠনের কেন্দ্রীয় অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম (পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা) ফেসবুক একাউন্টে নতুন নির্দেশনা দেন। নির্দেশনায় বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, জেলা ও মহানগরের যারা আন্দোলন সমন্বয় করছেন তাদের আলাদা করে সমন্বয় কমিটি গঠন করতে হবে। দল মত নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণের সুযোগ থাকতে হবে।
বিতর্কিত কাউকে নেতৃত্বে নয়, গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব প্রত্যাশা। আন্দোলনকে একক বা মূল নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল করবেন না। নতুন নেতৃত্ব প্রস্তুত রাখতে হবে। আন্দোলনকে কোনো সাংগঠনিক রূপ দেওয়া যাবে না (দৈনিক জন্মভূমি, ১৪ জুলাই ২০২৪)।
আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ও অহিংস হবে। মিডিয়া কর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক, কোনো পক্ষের কাছ থেকে আঘাত বা হুমকি আসলে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। ঢাকার সাথে সমন্বয় করে কর্মসূচি প্রণয়ন, মাইকিং, লিফলেটের মাধ্যমে গণসংযোগ, অর্থ সংগ্রহের জন্য সরাসরি ক্রাউড ফাইন্ডিং, হিসেবের স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক স্বার্থ থাকলে এমন কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নেওয়া যাবে না। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ নেওয়া যাবে না।
ছাত্রলীগের হুঁশিয়ারি : নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইমন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “কোটা ইস্যুতে কাউকে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে দেওয়া হবে না। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, কোটা আন্দোলন সন্ত্রাসীদের গেট টুগেদার। আমরা এখানের আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সম্পৃক্ততা দেখতে পাচ্ছি (দৈনিক খুলনা)।
মামলা তুলে নিতে পুলিশকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম : এদিকে এদিন সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে কোটার যৌক্তিক সংস্কারের এক দফা দাবিতে গণপদযাত্রা কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনকারীরা। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নামে করা মামলা তুলে নিতে পুলিশকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন তারা। ১৩ জুলাই সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। একই দাবিতে ১৪ জুলাই রবিবার রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপিও প্রদানের ঘোষণা দেন তারা। পাশাপাশি জেলা শহরগুলোতে শিক্ষার্থীদের পদযাত্রা সহকারে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি প্রদানের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ১৪ জুলাই বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে শিক্ষার্থীরা গণপদযাত্রায় অংশ নেবেন। এরপর শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সাত কলেজ ও ঢাকার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এতে অংশগ্রহণ করবে। এ ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা পদযাত্রা নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেবেন।
আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, শাহবাগ থানায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অজ্ঞাতনামা মামলা করা হয়েছে। সেখানে পুলিশ বলছে যে শিক্ষার্থীরা তাদের ক্ষতি সাধন করেছে। ক্ষতি যদি হয় তাহলে অজ্ঞাতনামা মামলা দেওয়ার প্রয়োজন নেই, আমাদের নামেই মামলা দিতে পারেন।
এইদিন আন্দোলনকারীদের দাবি ও বক্তব্যকে সংবিধান এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির বিরোধী বলে মন্তব্য করেন ওবায়দুল কাদের। রাস্তা বন্ধ না করে আন্দোলন থেকে সরে আসতে বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।
এদিকে পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) হারুন অর রশীদ বলেন, আন্দোলনের নামে জানমালের ক্ষতি করলে কিংবা সড়ক অবরোধ করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌক্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং তাদের দাবি ন্যায্য হলেও সরকার ভিন্ন খাতে নিতে অপকৌশল করছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস।
কোটা সংস্কারের বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকায় নির্বাহী বিভাগ এই মুহূর্তে আনুষ্ঠানিক কোনও ঘোষণা দিলে তা অসাংবিধানিক হবে বলে মন্তব্য করেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) গণসংযোগ : ১৩ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) দিনব্যাপী গণসংযোগ করে আন্দোলনকারীরা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল ও সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে এ গণসংযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় সমন্বয়ক কমিটি : এছাড়াও এইদিন রাত ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে চলমান আন্দোলন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সমন্বয়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ৩৮ সদস্যের এ কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ব্যাচের ২৪ জন শিক্ষার্থীকে সমন্বয়ক এবং ১৪ জনকে সহসমন্বয়ক হিসেবে রাখা হয়।
এদিকে কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজবাড়ী রেলস্টেশনের সামনে শনিবার রেললাইনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় ঢাকাগামী মধুমতী এক্সপ্রেস আটকে দেন তারা।
খুলনা গেজেট/এনএম

